Breaking News

রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট আগামী ১০ দিন প্যারোল না জামিন, শপথ না বর্জন সব সুরাহা

একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ছয় প্রার্থীর শপথ নেওয়ার সময় আছে মাত্র ১০ দিন। কারান্তরীণ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি, শপথ নিয়ে সংসদে যোগদানসহ অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে এ কয় দিনে। সরকার চায় নির্বাচিত সব এমপি সংসদে যোগ দিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করুক। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার প্যারোল আবেদন করলে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হবে না।

তবে বিএনপি চায় তাদের দলীয় প্রধানের জামিনে মুক্তি। দলীয় ছয় এমপি শপথ নিতে আগ্রহী হলেও হাইকমান্ডের হুঁশিয়ারি এটা করলে দল থেকে তাদের চিরতরে বহিষ্কার করা হবে। আগামী ১০ দিনকে রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ কয় দিনে ঘটতে পারে অনেক কিছু। প্যারোল-শপথ নিয়ে দুই পক্ষ এখন পর্যন্ত দুই মেরুতে অবস্থান করলেও পর্দার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয়পক্ষ নমনীয় হলে রাজনীতিতে সমঝোতার আভাস মিলবে আগামী ১০ দিনের মধ্যেই।  সংখ্যায় কম হলেও শপথ নিয়ে সংসদে ঝড় তুলতে পারবে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। আর এমপিরা শপথ না নিলে অথবা শপথ গ্রহণ করতে না পারার উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে স্পিকারের কাছে আবেদন না করলে শূন্য হয়ে যেতে পারে সংসদীয় আসন।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতি নির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হয়েছেন, তাদের সংসদে দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। সে জন্য দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বার সংসদে যোগ দিতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতারা বলছেন, ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত দুই নেতার মতো বিএনপির নির্বাচিত ছয় এমপিও শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেবেন। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, শপথ নিয়ে সংসদে না এলে বিএনপির আরেকটি ভুল হবে। আমরা বিশ্বাস করি এলাকার জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিএনপি সংসদে এসে ভূমিকা রাখবে। সংসদকে প্রাণবন্ত করবে। তারা ৬ জনে ৬০ জনের কথা বলবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘যদি খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে অথবা বিএনপির পক্ষ থেকে তার প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা হয়, সে ক্ষেত্রে তারা বিবেচনা করতে পারেন।’ বিএনপির পক্ষ থেকে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির নির্বাচিত ৬ এমপিকে শপথ নিয়ে সংসদে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি সংসদে যোগ দিলে তা হবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি তারা সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রশ্নে তিনি বলেন, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) এখন কারাগারে। তিনি যদি জামিন প্রার্থনা করেন আদালতই একমাত্র তাকে জামিনে মুক্তি দিতে পারে। অন্যদিকে তিনি যদি প্যারোলে মুক্তি চান তাহলে তার আবেদনটি সরকার বিবেচনা করবে। এ ছাড়া তার মুক্তির অন্য কোনো পথ নেই।

সংসদে যেতে আগ্রহী ছয় এমপি, হাইকমান্ডের ‘না’: বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা জাতীয় সংসদে যেতে আগ্রহী। এলাকার মানুষের নানামুখী চাপের কথা তারা দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সংসদে গিয়ে বেগম জিয়ার মুক্তি দাবি তোলার যুক্তিও তুলে ধরেছেন তারা। তবে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটি তাদের ‘না’ করে দিয়েছে।

সম্প্রতি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্কাইপিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সংসদে যাওয়া যাবে না। এরপরই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই বৈঠকেও বলা হয়, বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো সংসদে না যাওয়া। কেউ এককভাবে যদি সংসদে যেতে চান, তাহলে বহিষ্কার করা হবে। সংসদ অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হয়। সে হিসেবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত শপথ নেওয়ার সময় রয়েছে বিএনপির এমপিদের। এর মধ্যে শপথ না নিলে স্পিকারের কাছে আবেদন করার সুযোগও পাবেন তারা। তবে তারা আবেদন না করলে ওই আসন শূন্য হয়ে যাবে।

সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি হাসপাতালে বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় তারা বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তি ও সংসদে যাওয়া না যাওয়ার প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। এ সময় বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে সরাসরি ‘না’ জানিয়ে দেন।

একইভাবে সংসদে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই ছয়জন সংসদে গিয়ে কী করবে? আমাকে কারামুক্ত করতে পারবে? বেগম জিয়ার নেতিবাচক মনোভাব দেখে নেতারা এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়াননি বলে জানা গেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যে নির্বাচন ও তার ফলাফলকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, নির্বাচন হিসেবেই মেনে নিইনি- সে সংসদে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এই নির্বাচন জাতীয় জীবনে এক ভয়ানক কলঙ্ক। আমরা অবিলম্বে তা বাতিল করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচন দাবি করেছি।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ৬ সংসদ সদস্যের শপথ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত সংসদে যাওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সম্মতিক্রমে আমরা স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুতরাং এ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা যাবে না।’

তবে ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির একাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সংসদে যেতে আগ্রহী। তারা আশা প্রকাশ করছেন, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। তারা যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, বিএনপির ক্ষুদ্র প্রতিনিধি দলও সংসদে গেলে দৃষ্টি তাদের দিকেই থাকবে। তাছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সংসদকে তারা জানাতে পারবেন। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি সংসদেও এ নিয়ে ঝড় তোলা যাবে।

এ প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার আসনটি প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছে। আমি এ মুহূর্তে চরম বিপদে রয়েছি। নেতা-কর্মীদের ৯৫ ভাগই চান, আমরা যেন সংসদে যাই। তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত হলো যাওয়া যাবে না। তবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের শপথ নেওয়ার সময় আছে। এর মধ্যে দলের ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত আছে কিনা জানি না। তবে দল না চাইলে আমরা সংসদে যাব না।’

বগুড়া-৪ আসন থেকে নির্বাচিত মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এলাকার জনগণ চায়, আমরা যেন সংসদে গিয়ে সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদ করি। কিন্তু বাস্তবতাও দেখতে হবে। আমি দল করিÑএ কারণেই জনগণ আমাকে চেনে। আমাদের কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান না চাইলে সংসদে যাব না।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হারুন অর রশীদ বলেন, ‘যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের ওপর এলাকার মানুষের চাপ আছে, এটাও সত্য। কিন্তু আমরা নির্বাচিত হয়েছি দলীয় প্রতীকে, দলের সমর্থনে। এখানে দলের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখন পর্যন্ত একমত যে, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে  কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় এমপি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এ নিয়ে সংশয়ে আছি। দলীয়ভাবে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছি। এলাকার জনগণ চাচ্ছে আমি যেন শপথ নিয়ে এলাকায় ফিরে যাই।’      

প্যারোল নয়, জামিনে মুক্তি চান খালেদা জিয়া: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নিতে চান না। প্যারোলের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। অতি সম্প্রতি বিএনপির তিনজন নীতিনির্ধারক তার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গেলে তাদের সঙ্গে আলাপকালে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রয়োজনে মৃত্যু পর্যন্ত জেলখানায় থাকব। তবুও প্যারোলে মুক্তি নেব না। কারামুক্ত হতে হলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আদালত থেকে জামিনেই মুক্ত হব। কোনো ধরনের প্যারোল বা শর্ত-সাপেক্ষে নয়।

সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তা জানা গেছে। জিয়া পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ-ই চান না খালেদা জিয়া প্যারোলে কারামুক্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। তবে দলের একটি অংশের নেতারা চান চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর জেলখানায় শারীরিক ও মানসিকভাবে যে জুলুম-নির্যাতন চলছে, তা থেকে রেহাই পেতে এবং তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসায় অবিলম্বে তার বিদেশে যাওয়া উচিত। আগে নিজের জীবন ও সুস্থ শরীর। তারপর রাজনীতি।

বিডি প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *